শনিবার, জুন ১৫, ২০২৪

কমছে পানি, ভাসছে ক্ষত

নিজস্ব প্রতিবেদক:

কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত বৃষ্টি হয়নি। বুধবার ভোর হালকা বৃষ্টি হলে তা বেশিক্ষণ স্থায়ী ছিল না।

এ পরিস্থিতিতে নামতে শুরু করেছে বন্যা কবলিত এলাকার পানি। এখন পর্যন্ত বন্ধ আছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সরাসরি যান চলাচল। তবে আনোয়ারা-বাঁশখালী-পেকুয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার যান চলাচল করছে।

পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে ভেসে উঠছে ক্ষত চিহ্ন। কোথাও মহাসড়ক, সড়ক, কাঁচা রাস্তা, আবার কোথাও কালভার্ট, ভেঙ্গে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে। বীজ তলা, ফসলের মাঠ, মাছের ঘের, বেড়িবাঁধ, ঘর ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান যেন লণ্ডভণ্ড হওয়ার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

পানি নামতে শুরু করলেও ঘরে ফিরে নতুন শংকায় কবলিত এলাকার মানুষ। যে রান্না করে খাবার কোন পরিবেশ নেই। তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির।

বুধবার সকালে চকরিয়া উপজেলার পানিতে ডুবে থাকা কিছু সড়কের দৃশ্য দেখা মিলে ভাঙনের তীব্রতা। কাকড়া-মিনাবাজার সড়কটির ৩ কিলোমিটার এলাকায় কমপক্ষে ৫০ টি ভাঙন সড়কটিকে চলাচল অনুপযোগি করে দিয়েছে।

ওই এলাকার বৃদ্ধ রহিম উদ্দিন জানিয়েছেন, ৪ দিন ধরে কমপক্ষে ৪-৫ ফুট পানিতে বন্ধি ছিলেন তারা। পানি ক্রমাগত নেমে যাচ্ছে। সাথে সাথে সড়কের ভাঙন, ঘর-বাড়ি বিধ্বস্ত, ফসলী জমি ও মাছের ঘেরের ক্ষতি দেখা যাচ্ছে। যাদের বাড়ি-ঘর এখনও রয়েছে তারাও বাড়িতে গিয়ে রান্না করার সুযোগ নেই। বাড়ির ভেতরে পানি বের করার চেষ্টা করছেন। খাবার পানিও পাওয়া যাচ্ছে না।

এলাকার জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় লোকজন ও সরেজমিনে দেখা যায়, জিদ্দাবাজার-কাকারা-মানিকপুর সড়কের কয়েকটি অংশে ভাঙন রয়েছে। মাতামুহুরী নদী নিকটবর্তী গ্রামের বসতঘরগুলো বিধ্বস্ত হয়েছে নানাভাবে। চকরিয়া ও পেকুয়ায় বেশ কয়েকটি বেঁড়িবাধ ভেঙ্গে লোকালয়ে মিশে আছে পানি। চকরিয়ার পৌর শহরের শপিং কমপ্লেক্স, বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের পানি বের করার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকার ক্ষতির আশংকা করছেন।

চকরিয়ার লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, সাহারবিল, চিরিঙ্গা, পূর্ব বড় ভেওলা, বিএমচর, পশ্চিম বড় ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, ফাঁসিয়াখালী, বদরখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী এবং পেকুয়া উপজেলার পেকুয়া সদর ইউনিয়ন, উজানটিয়া, মগনামা, রাজাখালী, টৈটং, শিলখালী, বারবাকিয়া ইউনিয়নের পরিস্থিতিও একই।

এছাড়াও মহেশখালী, কুতুবদিয়া, উখিয়া ও রামুতে নানা ক্ষত-ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন, কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বিভীষণ কান্তি দাশ।

তিনি জানিয়েছেন, প্রাথমিক যে তথ্য হাতে এসেছে তাতে ক্ষতির পরিমাণ ২ কোটি টাকার বেশি। এটা অনেক বেশি হতে পারে। এ পর্যন্ত যে তথ্য মিলেছে, তাতে বন্যা কবলিতা এলাকার মধ্যে চকরিয়া-বদরখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের ৬ কিলোমিটার, ইয়াংগা-মানিকপুর- শান্তিবাজার সড়কের ১১ কিলোমিটার, লক্ষ্যারচর- বেথুয়াবাজার- বাগগুজারা সড়কের ১১ কিলোমিটার, একতাবাজার- বনৌজা শেখ হাসিনা সড়কের আধা কিলোমিটার, বরইতলী- মগনামা সড়কের ৭ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম- কক্সবাজার- টেকনাফ মহাসড়কের আড়াই কিলোমিটার, ৩ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা, ৩ টি কালভার্ট বিধ্বস্ত হয়েছে। এর সাথে ঘর, মাছের ঘের, বেড়িবাঁধ, ফসল, বীজতলা সহ অন্যান্য ক্ষতি রয়েছে। যা এখনও নির্ধারণ করতে কাজ চলছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ২৪ ঘন্টা ধরে বৃষ্টিপাত বন্ধ থাকায় মাতামুহুরী নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। ফলে চকরিয়ার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে ঢলের পানিও কমতে শুরু করেছে। তবে তা খুবই ধীর গতিতে। চকরিয়া উপজেলার কাকারা, লক্ষ্যারচর, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, সাহারবিল, চিরিঙ্গা, পূর্ব বড় ভেওলা, বিএমচর, পশ্চিম বড় ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, ফাঁসিয়াখালী, বদরখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালীর নিম্নাঞ্চল এখনও ৪-৬ ফুট পানির নিচে রয়ে গেছে। ফলে চরম দুর্ভোগে রয়েছে বানভাসি লক্ষ মানুষ।
অপরদিকে, পেকুয়া উপজেলায় কয়েকটি বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে পেকুয়া সদর ইউনিয়ন, উজানটিয়া, মগনামা, রাজাখালী, টৈটং, শিলখালী, বারবাকিয়া ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে কিছুটা পানি কমেছে।

কয়েকটি ইউনিয়নের বন্যা দূর্গত স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এখনো নগন্য সংখ্যক বসতবাড়ি থেকে বন্যার পানি নামলেও সেসব বসতঘরের পরিবেশ এখনও রান্নার উপযোগী হয়ে উঠেনি। বন্যায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির ও খাদ্যের সংকটের বিপরীতে নগন্য খাদ্য সহায়তা দেয়া হয়েছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে। এখনো হাজার হাজার উপোস থাকা পরিবার কিছুই পায়নি বলে অভিযোগ তাদের।

এদিকে মঙ্গলবারে চকরিয়া বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন কক্সবাজার -১(চকরিয়া-পেকুয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ¦ জাফর আলম, জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শাহীন ইমরান, জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো.মাহফুজুল ইসলাম, চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেপি দেওয়ান, চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাবেদ মাহমুদসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা।
বন্যা কবলিত কাকারা ইউনিয়নের এমএমচর এলাকার বাসিন্দা খালেদুল ইসলাম বলেন, ‘গত চারদিন ধরে পরিবার নিয়ে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছি। কেউ রান্না করা খাবারতো দূরের কথা শুকনো খাবারও পাইনি। কেউ খবরও নেয় নিই। বাড়িতে যা ছিলো তা নিয়ে কাটাচ্ছি। বাড়ির সব জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে বন্যার পানিতে।’

জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক মানব সম্পদ বিষয়ক সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম সজীব বলেন, ‘আমি কোন জনপ্রতিনিধি না তবুও এলাকার সন্তান হিসেবে মানবিক দিক বিবেচনা করে আমার সাধ্যমতো শুকনো ও রান্না করা
খাবার পৌঁছে দিচ্ছি বন্যা দূর্গতদের বাড়িতে।’

চকরিয়া পৌরসভার মেয়র আলমগীর চৌধুরী বলেন, ‘বৃষ্টিপাত বন্ধ হওয়ায় পৌরসভার অধিকাংশ ওয়ার্ড থেকে পানি নেমে গেছে। যারা রান্নাবান্না করতে পারছেনা প্রতিটি ঘরে রান্না করা খিঁচুড়ি দেয়া হয়েছে। এছাড়াও শুকনো খাবার দেয়া হচ্ছে।’

চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেপি দেওয়ান বলেন, ‘মঙ্গলবার বিকেলে জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ হীন ইমরান বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। চকরিয়ার জন্য জেলা প্রশাসন ২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। শুকনা খাবারের পাশাপাশি চাল বিতরণ করা হচ্ছে।

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পূর্বিতা চাকমা বলেন, ‘এখনও অনেক বাড়িতে বন্যার পানি রয়ে গেছে। বন্যার পানি যাতে দ্রুত নেমে যায় সেজন্য বিভিন্ন এলাকায় বাঁধ কেটে দিয়েছি। জেলা প্রশাসন থেকে বরাদ্দ পাওয়া ১৫ টন চাল বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ও পানিবন্দী হয়ে পড়া লোকজনের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ¦ ফজলুল করিম সাঈদী বলেন, ‘চকরিয়া উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৮টি ইউনিয়নের জন্য ২০ টন শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও প্রতিটি ইউনিয়ন পরিদর্শন করছি। তাদের শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ করছি।’

আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ খবর