বৃহস্পতিবার, মে ২৩, ২০২৪

গরমে ফার্মেসির ওষুধ গুণমান হারাচ্ছে, স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধির আশংকা

সিসিএন অনলাইন ডেস্ক:

বাজারে থাকা বেশির ভাগ ওষুধের মোড়কের গায়ে ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে দেশে তাপমাত্রা ছিল গড়ে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এমন পরিস্থিতিতে দেশে বেশির ভাগ ওষুধের দোকানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা না থাকার কারণে নির্দেশিত তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ করা হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এতে একদিকে ওষুধ কার্যকারিতা হারাবে, অন্যদিকে এসব ওষুধ সেবনের ফলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রয়েছে এমন ফার্মেসি বা মডেল ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনার পরামর্শ দেন তাঁরা।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে দুই লাখ দুই হাজার ৫২৮টি ওষুধের দোকানের মধ্যে মাত্র ৪০০টি মডেল ফার্মেসি রয়েছে, আর ৩২ হাজার মডেল মেডিসিন শপ রয়েছে। মডেল ফার্মেসিগুলো নির্দিষ্ট নীতিমালার কিছুটা মেনে কার্যক্রম চালায়। এর বাইরে বেশির ভাগেই সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণ করা হচ্ছে না। জাতীয় ওষুধ নীতি-২০১৬-এ বলা হয়েছে, প্রত্যেক ওষুধের দোকানে শীতাপত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং রেফ্রিজারেটর ব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন ও ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, ‘মোড়কের গায়ে ওষুধের মেয়াদ ঠিক থাকে বলে এ নিয়ে সাধারণত মানুষজন কোনো প্রশ্ন তুলতে পারে না। এমনকি আমরা যদি কেমিক্যালি পরীক্ষা করি তাতেও দেখা যাবে ঠিকই আছে। কিন্তু এ ওষুধের গুণাগুণ ঠিক থাকে না। অর্থাৎ ওপরে দেখলে মনে হবে সব ঠিক আছে, কিন্তু ভেতরে নষ্ট থাকবে।’

অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, বাজারে প্রচলিত ওষুধের প্রায় ৯০ শতাংশই ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। এই তাপমাত্রার কম বা বেশি হলে ওষুধের কার্যকারিতা থাকে না। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে আছে বহুদিন ধরে। তাই ফার্মেসিতে বাধ্যতামূলক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও রেফ্রিজারেটর থাকার কথা বলা হয়েছে জাতীয় ওষুধ নীতিতে। কিন্তু সেটি গত আট বছরেও করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, ‘আমাদের সবার উচিত মডেল ফার্মেসি থেকে ওষুধ কেনা। একই সঙ্গে মডেল ফার্মেসি ও ফার্মাসিস্ট ছাড়া কোনো ধরনের লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করতে হবে। ফার্মেসিগুলো ওষুধ কোথা থেকে পেয়েছে এর যথাযথ প্রমাণ থাকতে হবে দোকানির কাছে। এতে একদিকে ভেজাল ওষুধ বিক্রি বন্ধ হবে, অন্যদিকে চিকিৎসাপত্র ছাড়া ওষুধ বিক্রি কমে আসবে।’

রাজধানীর শাহবাগ ও আজিজ সুপার মার্কেট এলাকার বিভিন্ন ফার্মেসি দোকানির সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, ওষুধের মোড়কের গায়ে ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ কথা বলা থাকলেও নষ্ট হয়ে যাবে এমনটা কম্পানি থেকে বলা হয়নি। এ ছাড়া অনেক সিরাপজাতীয় ওষুধ রেফ্রিজারেটরে রাখলে নষ্ট হয়ে যায়। তাই এগুলো অন্য সব ওষুধের মতোই রাখছেন তাঁরা।

বিভিন্ন দেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) অনুসৃত নীতিমালা অনুযায়ী, ফার্মেসির সাধারণ স্টোরেজ বা সংরক্ষণের তাপমাত্রার পরিসীমা ১৫-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতল অবস্থা হলো ৪৬-৫৯ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৮-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অতিশীতল হলো ৩৬-৪৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ২-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর যেসব ওষুধ সংরক্ষণের জন্য হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা প্রয়োজন পড়ে সেসব ওষুধ সংরক্ষণ করা হয় ২৫-৩৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা মাইনাস ৪ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সায়েদুর রহমান বলেন, ‘দেশে দুই লাখের বেশি ফার্মেসি রয়েছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশেই সংরক্ষণের সাধারণ যে নির্দেশনা রয়েছে তা অনুপস্থিত। সেখানে বিক্রি করা ওষুধগুলো অবশ্যই কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষের জন্য ক্ষতিকরও বটে।

তিনি বলেন, কিছু কিছু ড্রাগ অতিরিক্ত তাপমাত্রায় ক্ষতিকর অবস্থায় চলে যায়। এর মধ্যে কিছু অতি সংবেদনশীল হরমোন, অ্যান্টিবায়োটিক, ব্লাড প্রডাক্ট। এসব সংবেদনশীল ওষুধ একদিকে কার্যকারিতা হারাচ্ছে, অন্যদিকে সেবনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেড়ে যাচ্ছে।’

তবে এ বিষয়ে ঔষধ প্রশাসনের পরিচালক ডা. আইয়ুব হোসেন বলেন, ‘ওষুধের ধরন বুঝে ফার্মেসি মালিকদের নির্দেশনা দেওয়া আছে। এখন কেউ যদি রৌদ্রের মধ্যে রাখে, তবে সেটা তো নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকেই। এ জন্য দোকানে যেন রৌদ্র কম লাগে তার ব্যবস্থা নিতে হবে। যদি বেশি গরম থাকে, তবে অবশ্যই এসি লাগাতে হবে। এসব দায়িত্ব দোকানিকে নিতে হবে।’

তিনি বলেন, এমনিতে সারাক্ষণ যে বেশি তাপমাত্রা থাকে তা কিন্তু নয়। ওঠানামা করে। তাই যখন বেশি তাপমাত্রা থাকে তখন একটু সতর্কতার সঙ্গে ওষুধগুলো সংরক্ষণে রাখতে হবে। যারা ব্যবসা করবে তাদের এ ব্যবস্থাগুলো অবশ্যই করে নিতে হবে।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ খবর