সোমবার, মে ২০, ২০২৪

বাংলাদেশি দম্পতির অজান্তে মা-বাবা বানিয়ে এনআইডি বানালো রোহিঙ্গা যুবক

সাঈদুল ফরহাদ:

টেকনাফের স্থানীয় এক দম্পত্তির অজান্তে তাদের এনআইডি ব্যবহার করে সন্তান সেজে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বানিয়েছেন এক রোহিঙ্গা যুবক। ভয়ংকর প্রতারণা করা এই যুবকের নাম মো. রুহুল আমিন। তার স্ত্রী সেতারা বেগমের এনআইডি কার্ডও বানিয়েছেন একই কায়দায়।

রুহুল আমিন ২০০৪ সালে সস্ত্রীক মিয়ানমার থেকে চলে আসেন বাংলাদেশে। আশ্রয় নেন টেকনাফের হোয়াইক্যাং ইনিয়নের লম্বাবিল এলাকায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তার বাবার নাম আমান উল্লাহ। তিনি মূলত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য বুচিডং এলাকার বাসিন্দা। তিনি বর্তমানে উখিয়া ১৭ নং ক্যাম্পের বাসিন্দা হিসাবে রেশনসহ সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন।

২০০৬ সালে মমতাজ নামক একজনের সহয়তায় তিনি লম্বাবিল এলাকায় তাহফিজুল কোরআন মাদ্রাসাতুল এমদাদীয়া এতিম খানা ও নূরানী একাডেমী মাদ্রাসায় আরবি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর থেকে রুহুল আমিন ও তার পরিবার ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা শুরু করেন। এরই মধ্যে তিনি সৌদি আরবে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট। খুঁজে বের করেন নূর আহমদ নামে এক দালালকে।

পরে তিনি লম্বাবিল এলাকার মৃত মোক্তার আহমদ ও তার স্ত্রী নুর নাহার বেগমকে টার্গেট করে তাদের এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করে দালাল চক্রের মাধ্যমে রুহুল আমিন। পরে মোক্তার আহমদ ও তার স্ত্রী নুর নাহার বেগমের অজান্তে তাদের পিতামাতা সাজিয়ে ছবি, ঠিকানা ও এনআইডি কার্ড ব্যবহার করে। একই পন্থা অবলম্বন করেন তার স্ত্রী সেতারা বেগম। সেতারা বেগম তার এনআইডি কার্ডে লম্বাবিল এলাকার আরেক বাসিন্দা শামসু আলম ও তার স্ত্রী রশিদা বেগমের নাম ব্যাবহার করেন।

উপজেলা নির্বাচন অফিসে থেকে জাতীয় পরিচয় তৈরি করার দায়িত্ব নেন নুর আহমদ। এজন্য তাকে দিতে হয়েছে ৬০হাজার টাকা। দুই মাসের মাথায় রুহুল আমিন ও তার স্ত্রী সেতারা বেগমের হাতে চলে আসে বাংলাদেশের এনআইডি কার্ড। যার নম্বর ৯৫৫৫৬৫০৮৬১ (রুহুলআমিন), ১৫০১৩৫৩৯৬৩ (সেতারা বেগম)

এদিকে রুহুল আমিন ও তার স্ত্রী সেতারা বেগম প্রতরণার মাধ্যমে যাদের পিতামাতা সাজিয়ে ছবি, ঠিকানা ও এনআইডি কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশী হয়েছেন, ওই পরিবারগুলো চরম উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাদের দাবি, তাদের অজান্তে এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করে প্রতরণা করে বাংলাদেশী হয়েছে রুহুল আমিন ও তার স্ত্রী সেতারা বেগম। তাদের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাচন অফিসে অভিযোগ করার কথা জানান তারা।

মোক্তার আহমদের ছেলে ফায়সাল জানান, জাতীয় নির্বাচনের সময় আমার এক বন্ধু এমপি প্রার্থীর এজেন্ট বসেন। সেখানে তিনি দেখতে পান রুহুল আমিন নামক একজন তার পিতামাথা ও তার ঘরের ঠিকানা দেখতে পান। বিষয়টি আমাকে জানালে আমি চিনতে পেরে তার কাছে যায়। তখন তিনি আমাকে এটি ভুলক্রমে হয়েছে বলে সংশোধনের আশ্বস্ত করেন।কিন্তু এখনো করেনি। আমরা বিষয়টি চেয়ারম্যানকে জানিয়েছি।

এই বিষয়ে অভিযুক্ত রোহিঙ্গা রুহুল আমিন বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ছোটবেলায় আমার পিতা-মাতা মারা যায়। তাই আমি তাদেরকে পিতা-মাতা বানিয়ে এনআইডি তৈরি করেছি। তবে মোক্তার আহমদ থেকে অনুমতি নিয়ে এই এনআইডি করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে অভিযুক্ত রোহিঙ্গা রুহুল আমিন যে দালালের মাধ্যমে এনআইডি তৈরি করেছেন তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে চিংড়ি ব্যবসায়ী দাবি করেন। দালাল নূর আহমদ প্রতিবেদককে মুঠোফোনে প্রথম নিজেকে চিংড়ি ব্যাবসায়ী পরিচয় দিয়ে বলেন, আপনার পরিচয় কি? আপনার ঠিকানা কোথায়। একপর্যায়ে তিনি হুমকিস্বরূপ বলেন, ‘আপনি রুহুল আমিন নামক একজনকে কেন কল দিয়ে সে রোহিঙ্গা নাকি বাংলাদেশী জানতে চেয়েছেন তা জানতে চান। রোহিঙ্গা বাংলাদেশী হলে আপনার সমস্যা কোথায়? আপনি কিছু টাকা নিয়ে চুপ থাকেন। না হলে আপনি কীভাবে সাংবাদিকতা করেন দেখে নেবো বলে হুঁশিয়ারি দেন।

এই বিষয়ে হোয়াইক্ষ্যং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ আনোয়ারী বলেন, রুহুল আমিন নামে একজন ভুয়া পরিচয় পত্র দিয়ে এনআইডি কার্ড তৈরি করেছেন। সেটি আমরা জানতে পেরেছি। তার এনআইডি কার্ডে মোক্তার আহমদ ও নূর নাহার বেগম তার পরিচয় দিয়েছে প্রকৃত অর্থে তারা তার কেউ নন। তিনি প্রতরনা করে এসব এনআইডি তৈরি করেছেন।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আদনান চৌধুরী বলেন, বিষয়টি আমি আপনার মাধ্যমে জানলাম। গুরুত্ব সহকারে দেখছি।

আরও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ খবর